নিরাপদ ফসল উৎপাদন বলতে রাসায়নিক কীটনাশক ও সার ব্যবহারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক ও জৈব উপায়ে কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।...
বিস্তারিত আলোচন
টিস্যু কালচার হলো এমন একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি, যেখানে উদ্ভিদের কোষ বা টিস্যু থেকে নতুন অনুচারা তৈরি করা হয়।
ব্যবহার:
মাতৃগাছের গুনাগুন সম্পন অনুচারা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
অল্প সময়ে অধি...
বিস্তারিত আলোচন
ধান চাষে অন্যতম ক্ষতিকারক পোকা হলো পাতা মোড়ানো পোকা। সময়মতো দমন না করলে এটি ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে ফলন কমিয়ে দেয়। তাই এর পরিচয়, ক্ষতির ধরন, জীবনচক্র ও দমন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি।
পরিচিতিঃপূর্ণবয়স্ক এই পোকার ডানার উপর গাঢ় কমলা-বাদামী ঢেউ খেলানো দাগ থাকে। ডানার কিনারায় অসংখ্য ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। এরা মূলত ধানের পাতা আক্রমণ করে থাকে।
জীবনচক্র (Life Cycle)ঃএই পোকার জীবনচক্রে চারটি ধাপ রয়েছে এবং সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে প্রায় ৪৫-৫১ দিন। ডিম: স্ত্রী মথ পাতা বরাবর সারি করে ডিম দেয়। ৪-৬ দিনের মধ্যে তা ফোটে।লার্ভা/শুককীট: সদ্য ফোটা কীড়া সবুজাভ বর্ণের হয়। এরা প্রায় ২১-২৮ দিন ধরে খেয়ে বড় হয়।পিউপা/মূককীট: লার্ভা পাতা মুড়িয়ে তার ভেতরেই মূককীটে রূপ নেয়, সময় লাগে ৬-৭ দিন।পূর্ণাঙ্গ/মথ: ৭-১০ দিন বেঁচে থাকে ও নতুন ডিম পাড়ে।ক্ষতির ধরনঃ১. ডিম থেকে সদ্য ফোটা কীড়া কচি পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে → ফলে পাতায় সাদা দাগ দেখা যায়।২. আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে গিয়ে পোড়া পাতার মতো দেখায়।৩. বড় কীড়া পাতা লম্বালম্বি মুড়িয়ে নলের মতো ভাঁজ করে এবং ভেতরে বসে খায়।৪. ক্ষতির মাত্রা বেশি হলে ধানগাছ দুর্বল হয়ে যায় → ফলন কমে যায়।অনুকূল পরিবেশঃপাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ আমন মৌসুমে বেশি দেখা যায়। তবে আউশ ও বোরো মৌসুমেও আক্রান্ত হতে পারে।আর্দ্র আবহাওয়া ও ঘন চারা → পোকার আক্রমণ বাড়িয়ে তোলে।জৈবিক ও যান্ত্রিক দমন ব্যবস্থাঃ ডিম ও কীড়াসহ আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন। রাতে আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পূর্ণবয়স্ক মথ ধরুন। জমিতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্যে দমন করুন। চারা রোপণের প্রথম ৪০ দিন জমি আগাছামুক্ত রাখুন বায়োপেস্টিসাইড (যেমন নিমবিসিডিন) স্প্রে করুন। জমির ২৫% এর বেশি পাতা আক্রান্ত হলে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। রাসায়নিক দমন ব্যবস্থাঃসঠিক মাত্রায় ও নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে নিচের কীটনাশকগুলোর যেকোনো একটি ব্যবহার করতে পারেনঃ –স্পিনোস্যাড গ্রুপ (সাকসেস ২.৫ ইসি):১৫ মি.লি./১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন। ক্লোরোপাইরিফস গ্রুপ (ডিসপেল ৪৮ ইসি, মর্টার ৪৮ ইসি, এ্যনিটার ৪৮ ইসি ):২০ মি.লি./১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন। কার্বারিল গ্রুপ (সেভিন ৮৫ এসসি):৩৫ গ্রাম/১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন। আইসোপ্রোকার্ব/এমআইপিসি গ্রুপ (মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি):২৫ গ্রাম/১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে স্প্রে করুন।কারটাপ গ্রুপের কীটনাশক ৩০ গ্রাম /১০ লিটার পানিতে ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করুন। পরামর্শঃসবসময় IPM (Integrated Pest Management) পদ্ধতি মেনে চলুন। অর্থাৎ প্রথমে জৈবিক ও যান্ত্রিক উপায় ব্যবহার করুন, পরে প্রয়োজনে রাসায়নিক প্রয়োগ করুন। এতে খরচ কমবে, ETL ম্যানেজ ঠিক থাকবে পরিবেশ রক্ষা হবে এবং ভালো ফলন পাওয়া যাবে।
মিষ্টিআলু একটি গুরুত্বপূর্ণ কন্দ জাতীয় ফসল, যা এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং সহজে চাষযোগ্য খাদ্যশস্য, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্লোবাল খাদ্যশৃঙ্খলে মিষ্টি আলু সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হিসেবে পরিচিত, যার বৈশ্বিক উৎপাদন বছরে প্রায় ১৩১ মিলিয়ন টন এবং চাষের জন্য প্রায় ৯ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রয়োজন হয়।
এটি উচ্চমাত্রার শর্করা, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, আয়রন, পটাশিয়াম, উদ্ভিজ্জ আঁশ ও প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি একটি শক্তিশালী পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। মিষ্টিআলুর লতা ও পাতা পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যা কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে। বাংলাদেশের যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে এই ফসলের চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বারি-২, কমলা সুন্দরী, তৃপ্তি, ওকিনাওয়া, মুরাসাকি (জাপানি), পার্পল স্টার প্রভৃতি জাত স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। তবে, অন্যান্য অনেক ফসলের মতোই মিষ্টিআলুও বিভিন্ন পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে উইভিল পোকা (Cylas formicarius) অন্যতম। এটি ফসলের সবচেয়ে ভয়াবহ শত্রু হিসেবে পরিচিত এবং ফলনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা এবং এর ক্ষতির পরিমাণঃ
উইভিল পোকা মিষ্টিআলুর পাতার পাশাপাশি কাণ্ড ও কন্দ খেয়ে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। এই পোকার আক্রমণের ফলে মিষ্টিআলুর গাছ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে, যা ফলন কমিয়ে দেয় এবং ফসলের গুণগতমান নষ্ট করে। গবেষণা থেকে জানা যায় যে, উইভিল আক্রান্ত ক্ষেত্রের ফলন ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে এবং বাজার মূল্য ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রতি বছর প্রতি হেক্টরে ২ থেকে ৩ টন ফসল নষ্ট হতে পারে। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, উইভিল পোকা বিশ্বের অনেক দেশে বিশাল আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আফ্রিকায় এই পোকা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি করে, যা কৃষকদের জন্য একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। ফিলিপাইনে উইভিল আক্রান্ত ফসলের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়। বাংলাদেশেও এই পোকার কারণে কৃষকদের লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা উইভিল পোকার প্রজনন হার বৃদ্ধি করতে পারে, ফলে এর বিস্তার আরও ব্যাপক হতে পারে। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় পোকার জীবনচক্র দীর্ঘ হয় এবং তাদের প্রজনন হার কমে যায়, তবে ক্রমবর্ধমান গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে এই পোকার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
পোকার বাহ্যিক গঠন এবং জীবনচক্রঃ
উইভিল পোকাটি দেখতে অনেকটা পিপড়ার মতো এবং দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৬ থেকে ৮ মিলিমিটার হয়। এদের মাথা ও পেট কালো রঙের এবং বক্ষ ও পা উজ্জ্বল লালচে-কমলা রঙের হয়ে থাকে। মুখের অগ্রভাগে সূচালো এবং লম্বা শুঁড় থাকে, যা স্ত্রী উইভিলের জন্য লতা, কাণ্ড ও কন্দে ছিদ্র করে ডিম পাড়তে সহায়তা করে। স্ত্রী উইভিল সাধারণত পুরুষের তুলনায় লম্বাটে হয় এবং এদের শুঁড় বেশি দীর্ঘ ও সরু হয়। একবার পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর স্ত্রী উইভিল প্রতি জীবনচক্রে ১০০ থেকে ১৫০টি ডিম পাড়তে পারে এবং গড়ে ২ থেকে ৩ মাস বাঁচতে পারে।
উইভিল পোকার সম্পূর্ণ জীবনচক্র ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় নেয় এবং এতে চারটি প্রধান ধাপ রয়েছে, যা হলো ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণবয়স্ক পোকা। স্ত্রী উইভিল মিষ্টিআলুর লতা, কাণ্ড বা কন্দের অভ্যন্তরে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো ছোট এবং সাদাটে রঙের হয়। চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়, যা দেখতে সি-আকৃতির এবং এর কোনো পা থাকে না। লার্ভা আলুর কন্দের মধ্যে সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং স্টার্চ খেয়ে ফসলের গুণগতমান নষ্ট করে। এরপর এটি পিউপা দশায় প্রবেশ করে এবং সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উইভিলে পরিণত হয়।
ফসলের ক্ষতির ধরন এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ
উইভিল পোকার সবচেয়ে ক্ষতিকারক ধাপ হলো লার্ভা, যা আলুর কন্দের ভেতরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং স্টার্চ খেয়ে ফসলের গুণমান নষ্ট করে। উইভিল পোকার আক্রমণের ফলে ছত্রাকের সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা আরও বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্টার্চ খাওয়ার কারণে আলুর মধ্যে টারপিন উৎপন্ন হয়, যা আলুকে তিতা এবং দুর্গন্ধযুক্ত করে তোলে। ফলে বাজারে এই আলুর গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায় এবং রপ্তানির সম্ভাবনা কমে যায়।
উইভিল দমনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে জমিতে একটানা মিষ্টিআলু চাষ না করে ফসল পরিবর্তন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। আক্রান্ত আলু ও লতা জমি থেকে সরিয়ে ধ্বংস করতে হবে, যাতে পোকার বিস্তার রোধ করা যায়। মাটির নিচে আলুর টিউবার ১০ সেন্টিমিটার গভীরে লাগালে উইভিলের আক্রমণ কমে যাবে। ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে পূর্ণবয়স্ক উইভিল দমন করা যায়।
প্রাকৃতিক দমন ব্যবস্থার মধ্যে পরাগজীবী বোলতা (Bracon spp.) উইভিলের ডিম ও লার্ভাকে আক্রমণ করে এবং নেমাটোড (Steinernema, Heterorhabditis spp.) উইভিলের লার্ভাকে ধ্বংস করে। এছাড়া ছত্রাক (Beauveria bassiana, Metarhizium anisopliae) ব্যবহার করে উইভিল দমন করা সম্ভব। রাসায়নিক দমন ব্যবস্থায় পাইরিথ্রয়েড, নিওনিকোটিনয়েড
ও অর্গানোফসফেট কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবেশবান্ধব উপায় হিসেবে নিমের নির্যাস ও পাইরিগ্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় সমন্বিত পদ্ধতিতে কীটনাশক ব্যবহার করা শ্রেয়।
পরিবেশগত কারণ এবং এর প্রভাবঃ
উইভিল পোকার বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও পরিবেশগত কারণসমূহ। উষ্ণ আবহাওয়ায় এই পোকা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা উইভিলের লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক পোকাদের টিকে থাকার হার বাড়িয়ে দেয়, যা সংক্রমণের হার বৃদ্ধি করে। একইভাবে, খরা বা বন্যার মতো চরম জলবায়ুগত পরিবর্তন মিষ্টিআলুর শারীরবৃত্তীয় কাঠামো পরিবর্তন করে, যা উইভিলের জন্য আরো সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে উইভিলের বিস্তার কমানো সম্ভব।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণারঃ
প্রয়োজনীয়তা মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা দমনে আরও কার্যকর সমাধানের জন্য গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে উইভিল প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা যেতে পারে। বর্তমানে বায়োপেস্টিসাইড ও ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে উইভিল আলুর ভেতরে উইভিল পোকার কীড়া
বায়োপেস্টিসাইড ও ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে উইভিল নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন গবেষণা চলছে, যা কৃষকদের জন্য পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে, কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী উইভিল দমন সম্ভব।
টেকসই কৃষির উন্নয়নের জন্য পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উইভিল প্রতিরোধী কৌশল গ্রহণ করা দরকার। গবেষণার মাধ্যমে যদি উইভিল প্রতিরোধী মিষ্টিআলুর জাত তৈরি করা যায়, তবে এটি কৃষকদের জন্য বড় ধরনের সুবিধা বয়ে আনবে। এ ছাড়া, উন্নত কীটনাশক ও জৈবিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রয়োগ করে উইভিলের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস করা সম্ভব। ভবিষ্যতে স্মার্ট ফার্মিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে উইভিল পোকার উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা এবং যথাযথ প্রতিকার গ্রহণ করা সহজ হবে।
মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা কৃষকদের জন্য একটি বড় সমস্যা, যা ফসলের গুণমান নষ্ট করে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর বিস্তার বাড়ছে, তাই সতর্ক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করলে উইভিল দমন করা সম্ভব এবং কৃষকদের লাভ বৃদ্ধি পাবে।
ভূট্রা গ্রামীণ পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দানাজাতীয় ফসল, যা বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। ধানের পর এটি দানাজাতীয় শস্যের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ভুট্টার ভূমিকা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা উচ্চফলনশীল জাত ও উন্নত কৃষি প্রযুক্তির প্রচলনের ফলে সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে যদিও শীত মৌসুমে শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ভুট্টার চাষ হয়ে থাকে তবে গ্রীষ্ম মৌসুমেও এর আবাদ বাড়ছে। ভুট্টার বহুমুখী ব্যবহার যেমন পশু-পাখি ও মাছের খাদ্য, শিল্প উপাদান এবং মানব খাদ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার কারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শস্যে পরিণত হয়েছে। এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও বাজারমূল্যের কারণে ভুট্টার আবাদকৃত জমি এবং উৎপাদনের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৯ সালে যেখানে ভুট্টা উৎপাদন ছিল মাত্র ৭.৫০ লক্ষ টন, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন বেড়ে ৬৮.৮ লক্ষ টনে পৌঁছেছে (কৃষি তথ্য সংস্থা, ২০২৫)। যা দেশের বার্ষিক চাহিদা (প্রায় ৬৯ লক্ষ টন) পূরণে সক্ষম। ভুট্টাতে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্যমান বিদ্যমান থাকায় কেবলমাত্র পশু-পাখি এবং মাছের খাদ্য নয় মানুষের খাদ্য হিসাবেও এর গ্রহণযোগ্যতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।২০১৮ সালের পূর্বে ভুট্টা ফসল সাধারণত পোকামাকড়ের আক্রমণমুক্ত ছিল, যার ফলে কীটনাশকের ব্যবহারও ছিল সীমিত। তবে নভেম্বর ২০১৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা বিধ্বংসী ফল আর্মিওয়ার্ম (Spodoptera frugiperda) পোকা বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর ভুট্টা চাষে নতুন সংকট দেখা দেয়। এই পোকাটি তার দ্রুত বংশবৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্য এবং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে ভুট্টা ফসলের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফল আর্মিওয়ার্ম ছাড়াও কাটুই পোকা (Agrotis ipsilon) এবং মাজরা পোকা ভুট্টার জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে অন্যতম। এই পোকাগুলো মূলত ভুট্টার চারা, কান্ড এবং শস্যগুচ্ছ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে গ্রীষ্মকালীন ভুট্টায় উৎপাদনের প্রায় ৪০% পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগবালাই দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভুট্টা ফসলের পোকামাকড় দমনে সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা (IPM) একটি আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। পোকামাকড়ের জীবনচক্র, বাসস্থান ও আচরণবিধি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, জৈবিক দমন পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক শত্রু যেমন ট্রাইকোগ্রামা বা টেলেনোমাস প্যারাসিটয়েড পোকামাকড়ের ডিমে আক্রমণ করে তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করতে সক্ষম। একইসঙ্গে, নিয়মিত ক্ষেত পর্যবেক্ষণ রোগমুক্ত বীজের ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে বালাইনাশকের প্রয়োগ এই ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভুট্টা চাষে পোকামাকড়-প্রতিরোধী জাতের ব্যবহার এবং কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই সমাধান সম্ভব। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিকর পোকামাকড়ের শনাক্তকরণ ও দমন ব্যবস্থা সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োগ অপরিহার্য। ফলে, ভুট্টা চাষে আধুনিক গবেষণা ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কার্যকর সংযোজন স্ত্রী মথ পোকামাকড়ের আক্রমণ হ্রাস এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাঃবীজ শোধনকারী কীটনাশক যেমন-সায়ানট্রানিলিপ্রোল, টেট্রানিলিপ্রোল, থায়ামেথোক্সাম ইত্যাদি দিয়ে ভুট্টার বীজ শোধন করে জমিতে বপন করতে হবে; রবি মৌসুমে ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে অগ্রহায়ণ মাসের মধ্যেই বীজ বপন করলে ফল আর্মিওয়াম দ্বারা ক্ষতির মাত্রা কম হয়; একই জমিতে বার বার ভুট্টা চাষ পরিহার করলে ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার আক্রমণ কম হয়: ভুট্টার সাথে ফেলন, মুগডাল, মাষকলাই, ধনিয়া ইত্যাদি সাথী ফসল হিসেবে চাষাবাদ করলে প্রাথমিকভাবে ফল আর্মি ওয়ার্ম পোকার আক্রমণ কম থাকে; ভুট্টা ফসলে সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে ফল আর্মিওয়ার্ম এর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দমন ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি: পোকার উপস্থিতি পরিলক্ষিত হলে, ডিম বা সদ্য প্রস্ফুটিত দলবদ্ধ কীড়া চিহ্নিত করে মেরে ফেলতে হবে কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।জৈব নিয়ন্ত্রণঃবন্ধু পোকা যেমন- ট্রাইকোগ্রামা (হেক্টর প্রতি এক গ্রাম ট্রাইকোগ্রামা আক্রান্ত ডিম, যেখান হতে ৪০,০০০ হতে ৪৫,০০০ পূর্ণাঙ্গ ট্রাইকোগ্রামা বের হয়ে আসবে) এবং ব্রাকন (হেক্টরপ্রতি ৮০০-১২০০টি) নামক উপকারী পোকা ভুট্টা ফসলে অবমুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়াও জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়িয়ে যথাসম্ভব রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে পারলে প্রাকৃতিকভাবেই পরভোজী ও পরজীবী বন্ধু পোকাসমূহ কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে সংরক্ষিত হবে। ফলশ্রুতিতে ভুট্টা ফসলে ফল আর্মিওয়ার্মের ডিম এবং কীড়া প্রাকৃতিক উপায়েই বিনষ্ট হবে।আক্রান্ত ফসলে জৈব বালাইনাশকঃযেমন- ফাওলিজেন (স্পোডোপটেরা ফ্রজিপারডা নিউক্লিয়ার পলিহেড্রোসিস ভাইরাস), বায়ো-বিটিকে (বেসিলাস থুরিনজিয়েনসিস), বায়ো-চমক (সেলাসট্রাস এ্যাঙ্গুলেটাস), স্পিনোম্যাক্স (বেসিলাস থুরিনজিয়েনসিস + স্যাকোপলিস্পরা স্পিনোসা), প্রোম্যাক্স (এমামেকটিন বেনজোয়েট + অক্সিমেট্রিন), অ্যান্টারিও (বেসিলাস থুরিনজিয়েনসিস + এবামেকটিন), ডাইনামিক (বেসিলাস এ্যামাইলোলিকুইফেসিস) ইত্যাদি প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্যাকেট বা বোতলের গায়ের লেবেলের নির্দেশিত মাত্রা অনুযায়ী ৭ দিন পর পর ২-৩ বার গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে (BW MRI রিপোর্ট, ২০২৪)।রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণঃএকান্ত প্রয়োজনে রাসায়নিক কীটনাশকযেমন স্পিনোসাড (ট্রেসার ৪৫ এসসি ০.৪ মিলি/লিটার পানি বা সাকসেস ২.৫% এসসি ১.৩ মিলি/ লিটার পানি) বা এমামেকটিন বেনজোয়েট প্রোক্লেম ৫ এসজি ১ গ্রাম/ লিটার পানি) বা ক্লোরেনট্রানিলিপ্রোেল (কোরাজেন ১৮.৫% এসসি ০.৫ মিলি/লিটার পানি) বা ধ্রুবেনডায়ামাইড (বেল্ট ২৪ ডব্লিউজি ১ গ্রাম/ লিটার পানি) আক্রান্ত ভুট্টা ফসলে সুরক্ষা সরঞ্জাম পরিহিত অবস্থায় ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। একই গ্রুপের কীটনাশক পরপর দুবারের বেশি ব্যবহার করা যাবে না।ভুট্টার কাণ্ড ছিদ্রকারি পোকা (মাজরা পোকাঃ১.পোকা চেনার উপায়:মেটে রঙ্গের মথ মাঝারি আকারের। কোন কোনটির পাখায় রূপালী ফোটা থাকে। কীড়া প্রায়৩.৮ সেমি. লম্বা দেহের সামনে ও পেছনের দিকে সাদা রেখার মতো আছে এবং ঘাড়ের ৩য় খণ্ডাংশ থেকে পেটের ৩টি খণ্ডাংশ পর্যন্ত গাঢ় বেগুনি তাতে সাদা রেখা নাই।২. ক্ষতির ধরনঃলার্ভা কচি কাণ্ড ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে এবং ডিগ পাতার গোড়া কেটে দেয়। ফলে গাছের বিবর্ণ ডগা লক্ষণ প্রকাশ পায়। আক্রান্ত ডগা শুকিয়ে যায় এবং টান দিলে উঠে আসে।প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাঃশস্যের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতে হবে; ডিম সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে; শস্য পর্যায় অবলম্বন করা; পোকার সর্বোচ্চ উপস্থিতি এড়ানোর জন্য মৌসুমের শুরুতেই চারা রোপণ করতে হবে; নিয়মিত সেচের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা সুস্থিত রাখতে হবে; প্রাপ্তবয়স্ক মথ ধরার জন্য আলোক ফাঁদ কিংবা ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে; জমি এবং জমির আশেপাশের জায়গা থেকে আগাছা এবং পোকার বিকল্প আবাস দূর করতে হবে; চারা রোপণ বা বীজ বপনের পূর্বে জমিতে গভীর চাষ দিন; এতে মাটিতে কীড়ার জীবনচক্র ব্যাহত হবে।জৈব নিয়ন্ত্রণঃএ পোকার অনেক প্রাকৃতিক শত্রু থাকা সত্ত্বেও যেহেতু কীড়া ভুট্টার কাণ্ড এবং ডালপালার ভেতরে বাসা বাঁধে সেহেতু এ কীড়াগুলো খুব সহজে ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। কিছু ক্ষেত্রে পরজীবী ব্রাকোনিড বোলতা ওরগিলাস ইলাসমোপালপি এবং চিলোনাস ইলাসমোপালপি কীড়ার সংখ্যাবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। জৈব কীটনাশক যেমন নিউক্লিয়ার পলিহেড্রোসিস ভাইরাস, এসপারজিলাস ফ্ল্যাভাস ছত্রাক এবং বিউভারিয়া ব্যাসিনিয়া ছত্রাক অথবা ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ কীটনাশক প্রয়োগ করলেও এ পোকার নিয়ন্ত্রণ সহজতর হয়।রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণঃএকান্ত প্রয়োজনে রাসায়নিক কীটনাশকযেমন এমামেকটিন বেনজোয়েট গ্রুপের কীটনাশক এই পোকার বিরুদ্ধে ভালো কাজ করে। যেমন, সিয়েনা- ১ গ্রাম/লিটার; প্রোক্লেম- ১ গ্রাম/লিটার)। ভুট্টার গাছ যখন ৩-৪ পাতা অবস্থায় থাকে তখন প্রথম স্প্রে এবং সাত দিন পরে ২য় স্প্রে দিলে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।ভুট্টার কাটুই পোকাঃ১. পোকা চেনার উপায়:কাটুই পোকার বেশ কতক প্রজাতি আছে। কালোকাটুই পোকা বেশি ক্ষতিকর। উপরের পাখা ছাই ও ধুসর রঙ্গের ছোপযুক্ত, নিচের কিনারা ঝালের মতো। এরা হালকা ধুসর থেকে কালচে তেলতেলা ধরনের।২. ক্ষতির ধরনঃএ পোকা রাতের বেলা চারা মাটি বরাবর গাছ কেটে দেয়। সকাল বেলা চারা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাঃজমি চাষের সময় পোকার লার্ভা এবং পিউপা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে; কাটা চারার নিকটে লার্ভাগুলো লুকিয়ে থাকে। এ জন্য সকাল বেলা হাত দ্বারা আশপাশের মাটি খুঁড়ে লার্ভা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে:ক্ষেতে সেচ দেওয়া হলে লার্ভাগুলো বের হয়ে আসে। এ সময় কাঠি পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করতে হবে; সকাল বেলা কেটে ফেলা চারার আশে পাশে মাটি খুঁড়ে পোকা বের করে মেরে ফেলা; কেরোসিন (২-৩ লি./ হেক্টর হারে) মিশ্রিত পানি সেচ দেয়া; রাতে ক্ষেতে মাঝে মাঝে আবর্জনা জড়ো করে রাখলে তার নিচে কীড়া এসে জমা হবে, সকালে সেগুলোকে মেরে ফেলা; এ পোকা নিশাচর, রাতের বেলা সক্রিয় থাকে- তাই রাতে হারিকেন বা টর্চ দিয়ে খুঁজে খুঁজে পোকা মেরে ফেলা।জৈব নিয়ন্ত্রণঃকাটুই পোকার পরজীবী বোলতা, মাছি এবং ঘাসফড়িংসহ অনেক শত্রু আছে। ব্যাসিলাস থিউরিজেন্সিস, নিউক্লিয়ার পলি হেড্রসিস ভাইরাস এবং বিউভারিয়া ব্যাসিয়ানা সংঘটিত জৈব-কীটনাশক কার্যকরভাবে কাটুই পোকার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক শিকারী পোকার সংখ্যা বাড়ানো উচিত।রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণঃএকান্ত প্রয়োজনে রাসায়নিক কীটনাশক যেমন ল্যামডা সাইহ্যালোথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক যেমন: ক্যারাটে বা ফাইটার বা রিভা ২.৫ ইসি ১ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকেলে বা সন্ধ্যার পর গাছের গোড়ায় স্প্রে করা।
বাংলাদেশে রবি মৌসুমে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও লাভজনক ফসলগুলোর মধ্যে মিষ্টি কুমড়া অন্যতম। এটি একটি উচ্চ পুষ্টিমূল্যের সবজি, যার চাহিদা সারা বছরই থাকে। সঠিক সময় ও পদ্ধতি মেনে চাষ করলে অল্প বিনিয়োগে ভালো ফলন ও লাভ পাওয়া সম্ভব।
🌱 জমি নির্বাচন ও প্রস্তুুতি
মিষ্টি কুমড়া চাষের জন্য দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। জলাবদ্ধতা যেন না থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।জমি ৩–৪ বার চাষ দিয়ে মিহি করে নিতে হয় এবং শেষ চাষে ১০–১৫ টন ভালোভাবে পচানো গোবর সার মিশিয়ে দিতে হয়।
জাত নির্বাচন
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত এবং কিছু হাইব্রিড জাত বর্তমানে খুব জনপ্রিয়—
স্থানীয় জাত:
BARI Mistikumra-1
BARI Mistikumra-2
BARI Mistikumra-3
BARI Mistikumra-4
হাইব্রিড জাত:
Green Queen
Venus
Super Mistikumra
Thai Pumpkin
হাইব্রিড জাতগুলোতে ফলন বেশি হয়, আকার একরূপ এবং বাজারদরও ভালো পাওয়া যায়।
বীজ বপনের সময় ও রোপণ পদ্ধতি
মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপনের উপযুক্ত সময় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত।প্রতি একরে বীজ লাগে প্রায় ৬০০–৮০০ গ্রাম।উঁচু বেড বা মাচা তৈরি করে ২–২.৫ মিটার দূরত্বে চারা রোপণ করতে হয়।
মাচা পদ্ধতিতে চাষ করলে—
ফল মাটির সংস্পর্শে আসে না
পচন কমে
ফলের আকার ও রং ভালো হয়
সার প্রয়োগের নিয়ম (প্রতি একর ভিত্তিতে)
সার প্রকারপরিমাণইউরিয়া120 কেজিটিএসপি100 কেজিএমওপি80 কেজিজিপসাম20 কেজিদস্তা4–5 কেজিগোবর10–15 টনপ্রয়োগ পদ্ধতি:
টিএসপি ও গোবর পুরোটা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিন।
ইউরিয়া ও এমওপি ৩ ভাগে ভাগ করে ১৫, ৩০ ও ৫০ দিন পর পর গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করুন।
রোগ ও পোকামাকড় দমন
মিষ্টি কুমড়ায় সাধারণত কয়েকটি রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা যায়।
পাতা মোড়ানো ও ফলছিদ্রকারী পোকা: ইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার করুন।
ডাউনি মিলডিউ বা পাতায় দাগ: ম্যানকোজেব বা কপার অক্সিক্লোরাইড স্প্রে করুন।
পাতা পচা রোগ: পানি জমে থাকা এড়িয়ে চলুন এবং নিয়মিত জমি পরিষ্কার রাখুন।
সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ
প্রতি ৭–১০ দিন অন্তর হালকা সেচ দিতে হয়।
আগাছা দেখা দিলে হাতে পরিষ্কার করতে হবে।
মাচা তৈরি করলে ফলন ও গুণমান দুইই বাড়ে।
ফল সংগ্রহ ও ফলন
বীজ বপনের ৭৫–৯০ দিন পর থেকে ফল সংগ্রহ শুরু করা যায়।প্রতি একরে গড় ফলন হয় ২০–২৫ টন, যত্ন ভালো হলে আরও বেশি।
ফলন শেষে একরপ্রতি নিট লাভ হতে পারে প্রায় ৬০,০০০–৮০,000 টাকা পর্যন্ত।
পুষ্টিগুণ ও বাজার সম্ভাবনা
মিষ্টি কুমড়ায় ভিটামিন A, C, আয়রন, ফসফরাস, ক্যালসিয়ামসহ নানা পুষ্টি উপাদান রয়েছে।দেশীয় বাজারে যেমন এর চাহিদা আছে, তেমনি বিদেশেও (বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে) রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
উপসংহার
মিষ্টি কুমড়া একটি সহজে চাষযোগ্য, কম খরচে বেশি লাভজনক সবজি ফসল। সঠিক সময় ও পদ্ধতি অনুসরণ করলে অল্প জমিতেও উচ্চ ফলন পাওয়া সম্ভব।তাই এই রবি মৌসুমে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে দেখুন — “কম খরচে বেশি লাভ” এর বাস্তব উদাহরণ তৈরি করুন।
শিরাযুক্ত, নরমকাণ্ড বিশিষ্ট একবর্ষজীবী, গুল্মজাতীয় আগাছাটির নাম পার্থেনিয়াম। পার্থেনিয়াম একটি 'ইংরেজি শব্দ'। নামটি গ্রিক parthenos শব্দ থেকে উদ্ভুত হয়, অর্থ "কুমারী”। এটি উদ্ভিদের একটি প্রাচীন নাম। এটির অন্য নাম: কংগ্রেস ঘাস, গাজর ঘাস, চেতক চাঁদনী, র্যাগ উইড, হোয়াইট টপ, হোয়াইট হেড ও স্টার উইড প্রভৃতি। উদ্ভিদ জগতে কম্পোজিট পরিবারভুক্তের ১৬টি প্রজাতি রয়েছে। ১৬টি প্রজাতির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত। আমাদের দেশে যে পার্থেনিয়াম পাওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম: Parthenium hysterophorus
এবং পরিবার Asteraceae, এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি আগাছা।।
বিস্তারের ইতিহাস:
আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং উত্তর-পূর্ব মেক্সিকো। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল, আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে এ আগাছার বিস্তার ঘটেছে। আফ্রিকার কেনিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার কফি উৎপাদিত ফসলি জমিতে এ আগাছাটি বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু ভারত বর্ষে এ আগাছা বিস্তারের ইতিহাস রয়েছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে খাদ্যশস্য সাহায্যের জন্যই ভারতবর্ষে গম পাঠানো হতো সেটা ১৯৪৫ সালের কথা, এদেশটি তখনো খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। এই আমদানিকৃত গমের মধ্যেই এদেশে প্রবেশ করে পার্থেনিয়াম। এখন বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষে সর্বত্রই এই আগাছা দেখা যায়।
২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম এ আগাছাটি শনাক্ত করা হয়।
বৈশিষ্ট্য:
পত্র খাঁজযুক্ত, অধিক শাখান্বিত, বর্ষজীবী, খাড়া, হার্বজাতীয় উদ্ভিদ, অনেকটা চন্দ্রমল্লিকা গাছের পাতার মতো। এর উচ্চতা ০.৫-১.৫ মিটার হয়, সর্বোচ্চ ২.০ মিটার বা তার অধিক হতে পারে। জন্ম এর মাস খানেকের মধ্যেই ফুল ধরে। বছরের যে কোন সময় ফুল ধরতে পারে, বর্ষাকালেই বেশি দেখা যায়। ফুলগুলো সাদা ও ক্ষুদ্রাকার। বীজ পরিপক্ক হলে হালকা বাদামি রং ধারণ করে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই আগাছার বিস্তার দেখা যায়। একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ হতে ১০-২৫ বীজ উৎপাদিত হতে পারে। পানি, বায়ু, পশুপাখি, যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও পোশাকের সাহায্যে, এমনকি কাদামাটি, দূষিত কৃষি-পণ্যের (গোখাদ্য ও খাদ্যশস্য) মাধ্যমে বীজের বিস্তার ঘটে। বীজ হালকা ও প্যারাসুটের মতো হওয়ার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার ঘটা সহজতর হয়।
অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ
উপকারিতা:
ভারী পদার্থ ক্যাডমিয়াম (II) মিশ্রিত দূষিত পানি বিশুদ্ধ করতে P. hysterophorus পাউডার শোষক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পার্থেনিয়াম আগাছা ১৪ দিন যাবৎ পচিয়ে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা হলে মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যেতে পরে। যত উপকারিতার কথায় আলোচনা করি পার্থেনিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব মারাত্মক।
অপকারিতা:
পুরো গাছটিই সম্পূর্ণ ক্ষতিকর, বিশেষ করে ফুলের রেণুতে অবস্থিত Sesquiterpene Lactones বা SQL জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ 'পার্থেনিন, হাইমেনিন, হাইস্টেরিন, করোনোপিলিন'। এছাড়াও এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো হলো: ক্যাফেইক এসিড, পি-অ্যানিসিক এসিড প্রভৃতি। এ আগাছার আক্রমণে মাঠ ফসলের ৪০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে। মাটিতে নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সবজি বিশেষ করে আলু, বেগুন, টমেটোর ক্ষেত, কলার বাগান এবং আখের ক্ষেতে এ আগাছার প্রভাব অত্যন্ত বেশি। গরু এ আগাছা খেলে তার অস্ত্রে ঘা দেখা দেয় এবং দুধ উৎপাদন কমে যায়। পার্থেনিয়াম ভক্ষণে মহিষ, ঘোড়া, গাধা,ভেড়া এবং ছাগলের মুখে ও পৌষ্টিকতন্ত্রে ঘা, যকৃতে পচন প্রভৃ তি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ফুলের রেণু বা বীজ নাকে প্রবেশ করলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হয়। এ আগাছার বিষাক্ত পদার্থগুলো রক্তের সাথে মিশে চর্মরোগ, এলার্জি ও এক্সিমা হতে পারে।
ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল মাসে উঁচু-মাঝারি উঁচু জমিতে দ্রুত আগাছাটির বিস্তার শুরু হয় বিশেষ করে কলার বাগান, সবজি ক্ষেত, ফলের বাগান ও খালি জায়গাগুলোতে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আশেপাশের সকল জায়গা দখল করে নেয়, ফলে জীববৈচিত্র্যসহ মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এমন কি ফসলি জমি থেকে আগাছাটির দমন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। বেশি মাত্রায় আক্রান্ত জমিতে আগাছা পরিষ্কার করতে গেলে শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। এ ছাড়াও রেল লাইনের ধারে, কবরস্থানে, ইটের ভাটায় এবং মহাসড়কের দুই পার্শ্বে এর বিস্তার যেন দ্রুতই সম্প্রসারিত হয়েছে। আগাছাটির দমন করার বিষয়ে যেমনি উচ্চ মাত্রার গবেষণা দরকার, সাথে সাথে এটির নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো বিবেচনা করা হলে আগাছাটি নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশেই সম্ভব।
উঁচু এবং মাঝারি উঁচু জায়গাগুলো খালি না রেখে ফসল আবাদ করতে হবে যেন পার্থেনিয়াম আগাছা জমিতে প্রবেশ করতে না পারে। এ আগাছার সাথে কোন ফসল বা কোন আগাছা কোন অবস্থাতেই প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না।
রাসায়নিক দমন:
পার্থেনিয়াম আগাছার ২-৩ পাতা অবস্থায় গ্লাইফোসেট আগাছানাশক ঔষধ প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিঃ করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। অথবা গ্লাইফোসেট (২৪%) + ২.৪-ডি (১২%) আগাছানাশক ঔষধ প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিঃ করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
জৈবিক পদ্ধতিতে দমন:
রাস্ট:Puccinia melampodii এবং Zygogramma bicolorata beetle দ্বারা পার্থেনিয়াম আগাছা ধ্বংস করা যেতে পারে। পার্থেনিয়াম গাছে রাস্ট রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ৭০ ভাগ পাতা নষ্ট করা যায়। এ ছাড়া Zygogramma beetle পার্থেনিয়াম আক্রান্ত এলাকায় উন্মুক্ত করা হলে প্রাকৃতিক শত্রু পোকার ন্যায় আগাছার পাতা খাওয়ার মাধ্যমে ৮৫ ভাগ পার্থেনিয়াম আগাছা দমন করা যায়। জৈবিক পদ্ধতিতে এ আগাছা দমন করলে ফসলের কোন ক্ষতি হয় না।
সতর্কতা:
এ আগাছা দমন করার সময় সতর্কতা অবলম্বন একান্ত জরুরি, হাতে রাবারের গ্লোবস ও মুখে মাস্ক পরে নিতে হবে, শরীরে পোশাক এবং পায়ে জুতা পরিধান করতে হবে, কোনো অবস্থাতেই ধূমপান করা যাবে না।