নিরাপদ ফসল উৎপাদনে করণীয়

নিরাপদ ফসল উৎপাদন বলতে রাসায়নিক কীটনাশক ও সার ব্যবহারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক ও জৈব উপায়ে কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কৃষি উৎপাদন বন্ধির প্রধান অন্তরায়গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে

বালাই। বালাই বলতে প্রধানত ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড়, ইত্যাদি) প্রাণি, আগাছাকে বুঝায়, যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি রোগজীবাণু, কুমি, ক্ষতিকর মেরুদন্ডী (ইঁদুর, পাখি, সজারু, সাধুন করে। এর মধ্যে ক্ষতিকর বালাইব্যবস্থাপনার জন্য অতীতে শুধু রাসায়নিক ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। রাসায়নিক বালাইনাশকের উপর্যুপরি ব্যবহারের ফলে অনেক অপ্রধান ক্ষতিকর পোকা প্রধান ক্ষতিকর পোকায় পরিণত হচ্ছে ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বালাই দমনের অন্যান্য পদ্ধতির এবং প্রধান ক্ষতিকর পোকার দেহে কীটনাশকের প্রতিরোধ মধ্যে জৈবিক পদ্ধতির মাধ্যমে শুধু নির্বাচিত ক্ষতিকর পোকা ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয় এবং এর প্রভাবে কোন নতুন পোকা ক্ষতিকর পোকা হিসেবে আবির্ভূত হয় না এবং কোন ক্ষতিকর পোকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা উৎপন্ন করে না। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ

পদ্ধতি নিচে নিচে উল্লেখ করা হলো: 

বালাই সহনশীল জাতের চাষ

 ফসলের এমন অনেক জাত আছে যারা ক্ষতিকারক। পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ অনেকাংশে রোধ করতে পারে। যেমন-বিআর-২৬: বাদামি গাছফড়িং, পামরী পোকা, সবুজ পাতাফড়িং, টুংরো ও পাতা পোড়া রোগ, বিআর-৩১: বাদামি গাছফড়িং, পামরী পোকা খোল পোড়া ও পাতা পোড়া রোগ, বিআর-৩৫ পামরী পোকা, পাতা পোড়া ও ব্লাস্ট রোগ

আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ব্যবহার:

 সুস্থ সবল চারা নির্বাচন, সঠিক বয়সের চারা রোপণ, সারিতে রোপণ, সমকালীন চাষাবাদ, জৈবসারসহ সুষম সার ব্যবহার, আগাছা ব্যবস্থাপনা, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণে অধিক ফলন পাওয়া যায়। 

যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা: নিম্নোক্ত পদ্ধতি ব্যবহার বালাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় যথা-হাতজালের সাহায্যে পোকা ধরে মারা; জমিতে ফাঁদসহ অন্যান্য ফাঁদ ব্যবহার করা আলোক ফাঁদে পোকা কাদিসই সন্যান্য ফাঁদ ব্যবহার করা আলেক্যালিফেরোমন আকৃষ্ট করে মারা। আক্রান্ত পাতার আগা/ডগা কেটে দেয়া। 

সেক্স ফেরোমন ফাঁদের ব্যবহার

পোকা সেক্স ফেরোমন হচ্ছে যা কোনো প্রজাতির স্ত্রী মাছি পোকা কর্তৃক একই প্রজাতির পুরুষ মাছি পোকাকে প্রজনন কার্যে আকৃষ্ট করার জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি পুরুষ পোকার সংখ্যা হ্রাস করতে সাহায্য করে, ফলে প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং স্ত্রী পোকা অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিঘ্যপ্রতি ১১টি ফাঁদের প্রয়োজন হয় এবং ফেরোমন ফাঁদে ব্যবহৃত সাবান পানি ১.৫-২ মাস পরপর পরিবর্তন করতে হবে। 

ট্রাইকোগ্রামা বোলতা

ট্রাইকোগ্রামা এক ধরনের বোলতা যা শত্রু পোকার ডিমের পরজীবায়ন করে থাকে। বর্তমানে কার্ড ও ভায়ালে, (কার্ড সাধারণত ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের প্যাকেট

এবং ভায়াল হলো একটি ছোট কাঁচ বা প্লাস্টিকের বোতল) এ পরজীবী পোকা আমাদের দেশে পাওয়া যায়। ১ গ্রাম হোস্ট পোকার ডিমের মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ পরজীবী ট্রাইকোগ্রামা আক্রমণের শুরু থেকে শেষ ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ৭-১০ দিন পর থাকে। যা এক হেক্টর জমিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। পর এ বোলতা অবমুক্ত করতে হবে।

কীড়া পরজীবায়ন করতে পারে। একটি স্ত্রী ব্রাকন ৫০০-১০০০ 

ব্লাকন বোলতাঃ 

ব্রাকন এক ধরনের বোলতা যা শত্রু পোকার শত্রু পোকার কীড়া পরজীবায়ন করতে পারে। একটি শস্য মৌসুমে ৭-১০ দিন পর পর ৫-৬ বার পূর্ণ বয়স্ক ব্রাকন অবমুক্ত করতে হবে। জৈব/ভেষজ বালাইনাশক প্রয়োগ সবজির জাবপোকা,

জন্য নিম তৈল, বাইকাও/নিমবিসিডিন/মেহগনির তেলজাতীয় পাতাকাটা, পাতাভোজী, পাতা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ৩০-৫০ মিলি, নিম তেল মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বৈচিত্র্যময় চাষাবাদ একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে বিভিন্ন ধরনের ফসল পর্যায়ক্রমে চাষ করলে রোগ ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম হয়।

সাথী ফসল চাষ:

 একই জমিতে একসঙ্গে বা ততোধিক ফসল চাষ করলে একটির ক্ষতিকর পোকা অন্যটির জন্য উপকারী হতে পারে ফলে কাঁটনাশকের ব্যবহার কম হয়। আন্তঃফসল: একটি ফসলের সাথে একই

সময়ে একই জমিতে যখন অন্য একটি ফসল করা হয় তখন তাকে বলা হয় আন্তঃফসল। আন্তঃফসলের ক্ষেত্রে মূল ফসল এবং আন্তঃ ফসল দুটোই সারিতে রোপণ করা হয়। মূল ফসল কাটার অনেক আগে আন্তঃফসল তোলা হয়। উদহারণস্বরূপ বেগুন+রসুন আন্তঃফসল হিসেবে চাষাবাদ করলে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কম হয়। বিকর্ষক ফসল: কিছু সবজি ফসল আছে যেগুলো এক ধরনের গন্ধ ছড়ায়। এসব গন্ধে ক্ষতিকর পোকা সেগুলোর কাছে যেমন ধনিয়া, সজ, মৌরী ইত্যাদি আসতে পারেনা। এ সমস্ত ফসলকে বলা হয় বিকর্ষক ফসল।

ফেরোমন ফাঁদ

উদাহরণস্বরূপ: বেগুন ধনিয়া বিকর্ষক ফসল হিসাবে চাষাবাদ আকর্ষক ফসল/ফাঁদ ফসল। কিছু কিছু ফসল আছে যেগুলো করলে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কম হয়। কিছু কিছু ক্ষতিকর পোকাকে আকর্ষণ করে থাকে। এ সমস্ত ফসলকে যদি মূল ফসল, যাতে একই পোকা লাগে তার অভ্যন্তরে বা চারিদিকে লাগানো যায় তবে তাতে যে পোকা লাগে রক্ষা পায়। যেমন- বাঁধাকপি লাগানোর ১৫ দিন আগে ও পরে তা সহজে স্প্রে করে বা হাত দ্বারা মারা যায়। এতে মূল ফসল সরিষা লাগিয়ে দিলে জাব পোকা আসে এবং তা সহজে মারা যায়। এভাবে তামাক, টমেটো গাছকেও আকর্ষক ফসল হিসেবে যায়। ব্যবহার করা যায়, যা জাবপোকা দমনের জন্য ব্যবহার করা